Wednesday, October 3, 2018

মাতৃপক্ষ



মাটির প্রতিমার মতো দাঁড়িয়েছিল গৌরী ! সে পাথর হয়ে গিয়েছিলো ঘটনার আকস্মিকতায় | হতবাক হয়ে দাঁড়িয়েছিল কতক্ষন সে নিজেও জানেনা |
সে দাঁড়িয়ে আর সামনে পড়ে অজয় |  কিন্তু রাতটা শুরু হয়েছিল অন্যদিনের মতো একইভাবে |

কয়েক ঘন্টা আগের কথা :
বালিশে মুখ গুঁজে শুয়েছিল গৌরী | রাতে আর ঘুম আসতে চায়না | একা শুয়ে সে আনমনা হয়ে জেগে রয় | অজয় এখন ও ফেরেনি, রোজকার মতো আজ ও গিলছে হয়তো | আজ আবার তাদের ফিস্ট | ১০ ফুট বাই ১০ ফুটার টালির ঘরে একা রাত কাটানো এখন গৌরীর গা সওয়া হয়ে গেছে | চোখের জলের দাগ ও শুকিয়ে গিয়েছে, বোধহয় চোখের ও জলও | কাটা ঘা গুলো দগদগে , কিন্তু ব্যাথা আর হয়না | কিন্তু মনের দাগগুলো শুকোতে চায়না | সে আর তার সাথী ঘরের গুটিকয় আসবাব , একটা চৌকি, ১ টা মোড়া, খাটের পাশের দেওয়ালে লাগানো একটা কাঠের পাটাতনের উপর লোহার ট্রাঙ্ক, আর তার উপরে একটা মা দুর্গার ফটো দেওয়ালে টাঙানো | ফটোটা গৌরীরই আনা | সাথে কিছু রান্নার সামগ্রী ও জলের কুঁজো | এরাই তার সঙ্গী |
অনেক আশা নিয়ে বরের ঘরে এসেছিল, কিন্তু আজ সব আশা শেষ | কিন্তু জীবন এরকম ছিলনা|

দুই বড় ভাইয়ের পর তার জন্ম, টুকটুকে গায়ের রং দেখে বাবা নাম দিয়েছিলো গৌরী | দাদাদের আদরে বড় হয়েছিল সে | বাবা-দাদারা গরিব হলেও গ্রামে খাবার জুটতে কোনো অসুবিধে হয়নি কোনোদিন | উঠোন ঘেরা দোতলা মাটির বাড়িতে দিনগুলি সুখে কাটত |
পালকাকিমা অজয়ের সম্বন্ধ নিয়ে আসে, তার কোন এক দুঃসম্পর্কের দাদার ছেলে, কোলকাতাতে চাকরি করে | বাবা রাজি ছিলনা , বলেছিলো সবে তো একুশ , কিন্তু গ্রামের সবাই বললো ভালো সম্বন্ধ ছেড়োনা | বিয়েটাও হয়ে গেলো, অজয়দের গ্রামের বাড়ি তাদের থেকে ছোট হলেও মন্দ ছিলনা , কিন্তু অজয়কে শহরের বাড়ির কথা জিজ্ঞেস করলে বিশেষ বলতনা | শহরে এসে বস্তির মধ্যে এই ঘরটাতে এসে প্রথমে গৌরীর মাথায় বজ্রপাত হয় | তাও সে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছিল, হাজার হোক এটাই তার সংসার | কিন্তু অবিরাম মদ্যপ বরের হাতে লঞ্ছিত হয়ে তার মন ক্রমশ শুকিয়ে যেতে থাকে| অজয় অধিকাংশদিন রাতে মাতাল হয়ে ফেরে, কোনোদিন ফেরেনা , সে জানে সেইদিন গুলোতে সে কোন পাড়াতে যায় | আর যেদিন আসে সেদিন তারপর চলে অকথ্য অত্যাচার | ধর্ষিত হতে থাকে তার শরীর ও মন |
তার ভাবনায় ছেদ পড়ে , দরজাতে করা নাড়ার শব্দে, অজয়ের গলা
- দরজা খোল ।
কিন্তু শুধু অজয়ের নয়, আরো একটা কণ্ঠ সে শুনতে পায় | সে খুলতে যাবে ভাবছে এমন সময় অজয় চিৎকার করে ওঠে |
সে দরজা খোলে আর দরজা দিয়ে ঢোকে অন্য এক মিনসে | অজয় বাইরেই দাঁড়িয়ে বলে
- আজ তুই এই বাবুকে খুশি কর |
এই বলে অজয় দরজা বাইরে থেকে বন্ধ করতে গেলে গৌরী এক ধাক্কাতে লোকটাকে ঠেলে ফেলে  দরজা খুলে বাইরে বেড়িয়ে আসে |
ছুটে পালতে চায় , এতদিন এতো অপমান সহ্য করেছে মুখবুজে কিন্তু আজকে বড় তাকে বেচে দিতে চায়? অজয় তার পেছনে ছোটে |
বেশিদূর পালতে পারেনা , অজয় তার চুলের মুঠি ধরে ঘরে আনে, অন্য লোকটা ধাক্কা খেয়ে পড়ে জ্ঞান হারিয়েছে |
অজয়ের রাগ তখন লাগাম ছাড়িয়েছে ,
- তুই বাবুকে মারলি, তোর এতো সাহস|
কান্নাও বেরোতে চায়না গৌরীর মুখ দিয়ে , অজয় মেরেই চলে অবিরত | সে অজয়কে ঠেলে সারানোর চেষ্টা করে, হঠাৎ ধাক্কাতে টাল সামলাতে না পেরে অজয় গিয়ে ধাক্কা মারে পেছনের পাটাতনটাতে , সে বসে পড়ে সেখানেই আর তার মাথার উপর পড়ে সেই লোহার ট্রাঙ্ক |

তখনও পাথর হয়েই ছিল গৌরী আর সামনে পড়ে রয়েছে ট্রাঙ্ক, ও  অজয়ের রক্তাক্ত দেহ, মাথা থেকে অবিরাম রক্ত ঝরেছে , আর তার মাথার উপর মা দুর্গার অসুরদলনি মূর্তির ফটোটা | সম্বিৎ ফিরলো যখন পাশের বাড়ি থেকে ক্ষীণ শাঁখের আওয়াজ ভেসে এল আর তারপর অষ্পষ্ট কিন্তু অমোঘ সেই মন্ত্রোচ্চারণ যা সে ছোটবেলাতে মায়ের কোলে বসে শুনতো মহালয়ার ভোরে | গৌরীর মনে পড়ল আজ মহালয়া | মাতৃপক্ষের সূচনা | সে ঠিক করে ফেলেছে তার পরের পদক্ষেপ , ঘরে ফিরবে গৌরী , এবার পুজোতে ফিরবে সে তার বাবার ঘরে | আর দেরি নয়, সে দ্রুত বেড়িয়ে পড়ল ঘর থেকে , বাইরে পুব আকাশ একটু ফর্সা হতে শুরু হয়েছে | আর রেডিওতে ভেসেআসছে গান -
"বাজলো তোমার আলোর বেনু "
আলোর দিকে এগিয়ে চললো গৌরী |

Monday, October 1, 2018

আগমনী

পাড়ার মেয়ে-ঝি রা সবাই দল বেঁধে ইছামতীতে ভাসান দেখতে গেছে, পাড়া খালি, অন্যান্য বছর উমা ও যায়, ছেলের হাত ধরে। এবার অষ্টমীর অঞ্জলি দেওয়া ছাড়া গ্রামের মণ্ডপে উমা প্রায় যায়নি বললেই চলে । সেদিন ও ইচ্ছে ছিলনা, কিন্তু মা দুগ্গার পুজোতে না গেলে অকল্যাণ হয়। তাই প্রতিবারের  মত লালপাড় শাড়ীটা পড়ে সে অঞ্জলি দিতে গেছিল, একাই। কতদিন যে নতুন শাড়ি কেনা হয়না পুজোতে। উমার তার জন্য আফসোস হয়না। কিন্তু
একা যেতে ভালো লাগেনা তার। স্বামী ঢাকী তাই সে কোনবছর ই থাকতে পারেনা, প্রথম প্রথম মন খারাপ হত, এখন গা সওয়া হয়ে গেছে। কিন্তু যবে থেকে গনু জন্মেছে সে তাকে ছাড়া কখনও থাকেনি , একবেলার জন্য ও না। তাই এবার যখন গনু বাবার সাথে কাঁসর বাজাতে যাবে বলল, উমা রাজি হয়নি, মায়ের প্রাণ আকুল হয়েছে। সে স্বামীকে বলেছে
- এতটুকু ছেলে চার দিন ধরে কাঁসর বাজিয়ে হাত ব্যাথা করলে?
মহেশ হেসেছে। বলেছে
- আসুক না, কলকাতার পুজো দেখবে।
উমার মন কেঁদেছে। কিন্তু শেষমেষ রাজি হয়েছে।
পুজোর চারদিন যে কিভাবে কেটেছে।  তাও ভালো বাড়ির পুজো দশমীর সকালেই বিসর্জন।
আজ উমা নারকেল নাড়ু বানিয়েছে, পালদের বাগানে নারকেল টা পড়েছিল অষ্টমীর দিন, সে তুলে এনেছে , নইলে পুজোগন্ডার দিনে নারকোল এই পাড়াগাঁয়ে ও সস্তায় পাওয়া যায় কোথায়?
গনু নারকোল নাড়ু ভালোবাসে। আর একটু খই-মুড়কি। এতদূর থেকে আসবে ওরা, চারদিনের এত খাটুনি। এসে ভাত খাবে। মায়ের হাতের রান্নার অভাব গনু এই কদিন কি অনুভব করেছে? বাবুদের বাড়িতে দুপুরের ভোগে অনেক কিছু হয় উমা শুনেছে ।

বেলা প্রায় পড়ে এলো, উমা ও খায়নি, অপেক্ষায় বসে থাকতে থাকতে চোখ লেগে আসে তার। চটকা ভাঙে যখন চোখের উপর চেনা দুটো খুদে হাতের স্পর্শ পায়।

-এবার ছাড়!
- উঁহু! তোমার জন্য একটা জিনিস আছে।
- ওরে ছাড়।
- এইবার !
- এটা কিরে?
মহেশ হাসে,বলে
- তোমার ছেলে তার বায়নার টাকা আর বখশিস দিয়ে তোমার জন্য কিনেছে ।
আনন্দে গণেশের চোখদুটো চকচক করে ওঠে।
- মা জানো কত জন আমাকে বখশিস দিল, দশ টাকা করে!
খুশিতে উমার চোখ ভরে ওঠে।
- কি দরকার ছিল এসবের। এই কদিন কাঁসর বাজিয়ে হাত ধরেনি তো?
উমার গলা জড়িয়ে ধরে  মাথা নাড়ে গণেশ।
- পুজোতে সবার মায়েরা নতুন শাড়ি পড়েছিল, মা দূর্গাও। আমার মায়ের না হলে কিভাবে চলবে? কিন্তু পুজো তো শেষ হয়ে গেল।
চোখ মোছে উমা,
- কে বলল? পুজো মানে কি জানিস? ঘরে ফেরা। মা দুর্গার ঘরে ফেরা, ঘরের মানুষদের ঘরে ফেরা। আমার তো আজ পুজো।
জড়িয়ে ধরে গনেশকে, বুকের মধ্যে।
বাইরে ইছামতির কাশবন অশ্বিনের বিকেলের হওয়াতে মাথা দোলায়। বিসর্জনের ঢাকের তালের মধ্যে কোথাও যেন আগমনীর সুর ভেসে রয়।

Thursday, August 23, 2018

ঝরাপাতা

ও ঝরাপাতা , ঝরে গেছ !
ছিল কালও, সাথে
ছুঁয়েছিলে , হাত ছিল হাতে ।
আজ ছেড়ে গেছ ।

ও ঝরাপাতা , ঝরে গেছ !

বসন্ত বেলায় এসেছিলে কাছে ,
শরতে ছেড়ে গেছ ।
বৈশাখী ঝড়ে সাথে ছিল,
শ্রাবণের রাতেও বলেছিলে -
ভালোবাসি ।
সেই হাসি - মনে রেখে দেব।
তবু চাইলে হাত ছেড়ে দেব ।

ও ঝরাপাতা, ঝরে যেতে দেব ।

Friday, April 6, 2018

এলোমেলো বিকেলবেলা



নিজের সাথে আড্ডা দেওয়ার সময় আজকাল বড় একটা হয়না , অফিস যাওয়ার রাস্তার দেড় ঘন্টা সময়ের খানিকটা তাই কখনো সখনো সেই কাজে কাটিয়ে ফেলি, ব্যাঙ্গালোরের ভয়ঙ্কর যানজটে এতে কিছুটা সময় কাটে, কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রে সেটা হয় সন্ধ্যাতে, আজ হঠাৎ অফিস থেকে তাড়াতাড়ি বেড়োনোতে পড়ন্ত বিকেলে NH -4 দিয়ে ফেরার সময় হঠাৎ করে মনটা কেমন এলোমেলো হয়ে গেল, নিজের সাথে আড্ডা দেওয়ার বদলে মনটা চলে গেলো আমার সেই ছোট মফস্বল শহরে যেখানে আমি বছর কুড়ি আগে একটা ছেলে কে ফেলে এসেছিলাম, ছেলেটার বয়স তখন কত, সদ্য আঠারো পেরিয়েছে | হঠাৎ করে মনটা তার সাথে আড্ডাতে মেতে উঠলো|
বিকেলের এই পড়ন্ত রোদ্দুর চিরকাল ই আমার সব হিসেব এলোমেলো করে দেয়, হিসেবি বলে যদিও আমার বিশেষ দুর্নাম নেই | তবু হঠাৎ মনে পরে গেলো কিছু কথা | ছোট বেলা থেকে আমার পরিবারের লোকেদের মধ্যে বাবা-মা-দিদি আর দিদার বাইরে আমার সব চেয়ে প্রিয় ছিল আমার দুই কাকা | তাদের একজন বহরমপুর এই , আরেকজন কোলকাতাতে | গনেশ কাকা আমাদের বাড়িতে মাঝে মধ্যেই আসত | আমি যেদিন জয়েন্ট এর কাউন্সেলিং এর জন্য কলকাতা তে যাচ্ছিলাম , সেদিন কাকা ও ছিল এক এ ট্রেন এ | আমাকে কাকা বলেছিল " এই যে তুই আজ শহর ছাড়লি , একেবারেই, এরপর তোর ঘরে ফেরাটা বেড়াতে আসার মতো ছাড়া আর কিছু হবেনা "| হেসেছিলাম, কিন্তু মনটা হুহু করে উঠেছিল , কথাটা এতটা সত্যি সেটা সেদিন এ বুঝেছিলাম, কিন্তু তারপর থেকে প্রত্যেক দিন আরো বেশি বেশি করে বুঝি... এর ও অনেক বছর আগে সল্টলেকের ফ্ল্যাটে বসে কাকা আমাকে বলেছিল , " বাবু , চিরকাল আমরা বইতে পড়ে এসেছি যে মানুষ যাযাবর ছিল যতদিন না সে চাষবাস করতে শিখেছে, যেদিন থেকে চাষবাস করতে শিখেছে সেদিন থেকে সে ঘর বেঁধেছে , যাযাবর বৃত্তি ত্যাগ করেছে ... কিন্তু এটা সর্বৈব মিথ্যে... মানুষ চিরকাল  যাযাবর ছিল , আজ ও আছে, মাঝে খালি খড়কুটো নিয়ে দুটো দিন বিশ্রাম নিয়েছে সে যাত্রাপথে , তারপর পাখিদের মতোই দানার সন্ধানে উড়ে বেরিয়েছে |" সেদিন ওই কথাটার মানে সেভাবে বুঝিনি, তখন আমার বয়স কত নয় কি দশ | কিন্তু আজ আমি সাঁইত্রিশ | সেদিনের নিষ্পাপ ছেলেটা আজ অনেকটাই হারিয়েছে কালের কানাগলিতে | এখন তার হাতে আর শীতের দুপুরে লাটাই থাকেনা, বরং অদৃশ্য লাটাইতে বন্দি ঘুড়ির মতো সে পাক খেতে থাকে সকাল থেকে সন্ধ্যে আবার সকল থেকে সন্ধ্যে | সন্ধ্যের শাঁখে তার ডাকনাম ধরে ডাক আর কেউ দেয় না, তবু  কোনো অষ্টাদশী তরুণীর কণ্ঠস্বর শুনতে পাই.. "ভা আ আ আ  ইই ই ই ই ই ই ই ই "|
বিকেল সাড়ে পাঁচটা বাজলে সে আর ব্যাট বল নিয়ে ছাদে গিয়ে দাঁড়ায় না, বাবা এসে কয়েকটা বল করবে বলে | মা এর গা ঘেঁষে আঁচলের হলুদের গন্ধ নিতে সে আর আসেনা | বাবার সাইকেল এ চড়ে আর সে ঘুরতে বেড়াইনা , মা এর হাত ধরে হেঁটে ও না |
হঠাৎ দেখতে পাই আমি স্লিপ এ দাঁড়িয়ে , বুবুন কিপিং করছে, সৌমেন বোলিং , কিন্তু এবার ব্যাটসম্যান এর ব্যাট এর খোঁচা টা আমাকে ভেদ করে চলে যায় .... থার্ডম্যান দিয়ে মাঠের বাইরে, আমি যে আজ মাঠের বাইরে, মাঠের চৌহদ্দি তে আমি আর নেই, ছেড়ে এসেছি এক যুগ আগে |
রাস্তাতে টুকটুক আর মোটর সাইকেল এর ভীড়ে কয়েকটা সাইকেল ও দেখতে পাই , একটার সিট্ ভাঙ্গা তারমধ্যে | কিন্তু সেই ভীড় টার অংশ আমি আর নই | ভীড় টা অন্য সময়ে আর আমি অন্য |
হঠাৎ গাড়ির স্টিরিও তে একটা গানের কলি বেজে ওঠে  " ফিরতে চাইলে ফেরা যায় নাকি পেরিয়েছে দেশ কাল জানো নাকি এসময় |"
না , অনেক এলোমেলো বকে চলেছি , আর বেশি বলবো না , আরেকটা কথা মনে পড়ল, সেটা বলেই থামব |  এটাও কাকার বলা, কাকা আমাকে হ্যামলেট এর গল্প শোনানোর সময় এটা প্রথম বার বলেছিল, বিখ্যাত উক্তি, সবার জানা .. না আমার তখন ও জানা ছিলোনা, তখন আমি সবে সাত | সেটা হলো "To be, or not to be, that is the question  " | সেদিন প্রথম আমার পরিচয় " William Shakespeare'" এর সাথে | তবে সেটা কথা নয়| সেদিন যদিও এর বিন্দুমাত্র কিছু বুঝিনি , তবে আজ বুঝি কিছুটা |
ওই যে শুরুতে আঠারো বচ্ছরের ছেলেটির কথা বললাম , সেই ছেলেটাও মাঝে মাঝে আমাকে এক ই  প্রশ্ন করে, যদিও সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রেক্ষাপটে  ..  Did I want "TO BE (you) OR NOT TO BE" .. That is still the question.. তবে উত্তর টা তো জানা ... তবু দিতে পারি কই ?

Tuesday, July 26, 2016

সেই শুরু !!!

মোবাইল নম্বর পাওয়াটা নেহাত ই কাকতলীয় ! কলেজের ফার্স্ট গেট এর বাইরে মোহন'স বলে একটা রেস্তোরাঁ ছিল (আজ আছে কিনা জানিনা ) , তার একটা দুর্নাম ছিল খাবার দিতে বড্ডো দেরি করে বলে , যদিও তাতে কলেজের ছেলেপুলে দের ভীড় কিছু মাত্র কমতো না | কিন্তু ভাগ্যিস ওরা খাবার দিতে লেট করতো, আর সেদিন একটু বেশি ই দেরি করছিল, হয়তো ভাগ্যদেবী সেদিন আমার প্রতি সুপ্রসন্ন ছিলেন |

এদিকে ঘড়িতে 10 টা বাজতেই চললো !! রাত 10 টাতে লেডিস হোস্টেল এর গেট বন্ধ হয়, আগে থেকে অনুমতি না নিলে তারপর প্রবেশ নিষিদ্ধ | যথারীতি মহুয়া ও সুদীপ্তার ভ্রূকুঞ্চিত | মহুয়া যদিও বা স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করছিল, সুদীপ্তা খুব ই বিচলিত | বিশেষত এই সময় টাতে হোস্টেল এর ফোন পাওয়া ভগবানের দেখা পাওয়ার চেয়ে কিছু মাত্রা কম নয়| সবার কাছে তখন ও মোবাইল ফোন পৌঁছয়নি, সৌভাগ্য ক্রমে আমার কিছুদিন আগেই একটা জুটেছিল, নোকিয়া 3310 | ঈশিতার নম্বর টা মহুয়ার কাছে ছিল, সুতরাং ঠিক হলো ঈশিতা কে ফোন করা হোক, তাকেই দায়িত্ব দেওয়া হোক ব্যাপারটা ওয়ার্ডেন কে বোঝানোর| কিনতু এখানেও ওদের বিধি বাম | আগেই বলেছি সেদিন ভাগ্যদেবী সেদিন আমার প্রতি কৃপাদৃষ্টি দিয়েছেন, ঈশিতা ও সেদিন হোস্টেলে নেই, বাড়ি গেছে , তাই হোস্টেলে কথা বলতে গেলে "তাকেই" ফোন করতে হবে, তার কাছেও মোবাইল আছে, তাই নম্বর টা পেয়েই গেলাম ঈশিতার কাছ থেকে, ফোন বাজতেই "তার" গলা, ফোন টা সুদীপ্তা কে দিলাম , তাদের কথা হল, সমস্যা র ও সমাধান | আর তা সারা হতেই টুক করে নম্বর টা সেভ করে ফেললাম |

রাতে খাওয়া সারতে প্রায় এগারোটা , গার্লস হোস্টেলে ওদের কে পৌঁছে দিয়ে আমরা উলফের দিকে রওনা হলাম , রুম এ পৌঁছে খালি নতুন সেভ করা নম্বর টা দেখছি, হঠাৎ দু:সাহস জেগেই উঠলো, ফোনটা করেই ফেললাম |
- "হ্যালো"!
- "সুদীপ্তা-মহুয়া রা হোস্টেল এ পৌঁছে গেছে? ওদের ঢোকা নিয়ে ওয়ার্ডেন কোনো ঝামেলা করেনি তো? "
- "না না ! সব ঠিক আছে, সুদীপ্তা দি তো আমাদের ঘরেই বসে !"
-" আচ্ছা!! একটা কথা! আমি কাল এ কলেজ ছেড়ে চলে যাচ্ছি , জানিনা আর কোনোদিন দেখা হবে কিনা , তা যাওয়ার আগে কাল সকালে একবার দেখা করতে পারবি? পান্ডিয়া র বাইরে বক্সিং রিং এ ?"
- " কখন?"
- "এই ধরে 9 টা সাড়ে 9 টা !!! "
- " ঠিক আছে "
- "গুড নাইট !!"
না রাতের ঘুমে কোনো ব্যাঘাত হয়নি, আমি বরং দ্রুত ঘুমিয়ে পড়েছিলাম , একটু নেশার ঘোর ছিল আর কি !! তাই সকল টাও খুব দ্রুত হয়ে গেলো....
সকালে বাইরে ব্রেকফাস্ট সেরে এসে দেখি, "সে" তার এক বান্ধবীর সাথে বক্সিং রিং এ ....
কথা হলো অনেক ক্ষণ !!! মাঝে স্যাবি র আবির্ভাব , আর ওই যে আগেই বলেছি ভাগ্যদেবী বড়ই সুপ্রসন্ন আমার দিকে , ভাগ্যিস স্যাবি এসেছিলো, তাতে কি লাভ হয়েছিল তার বিশদে নাই বা গেলাম !!!
শেষ দেখা করতে গিয়েছিলাম .. কিন্ত বিসর্জনের মাঝে যে নতুনের আগমনীর সুর ও বাঁধা থাকে সে সত্য টা সেদিন আরেকবার প্রমান হয়েছিল ! আষাঢ়স্য প্রথম দিবস তখন ও আসতে দুদিন বাকি ছিল .... কিনতু বর্ষা যে সেদিন নেমেছিল সে মনে , প্রাকবর্ষার সে বৃষ্টি ধুয়ে দিয়েছিলো মনের সব দ্বিধা !!
না সেদিনই বলতে পারিনি মনের কথা কেউ ই, সে অন্য গল্প, আজ থাক !!

না!!! ভেবেছিলুম গপ্পো তাকে ওখানেই শেষ করব, কিন্তু বি.ই. কলেজের পাবলিক কে শান্ত করা কি  ওতই  সহজ !!!
সেদিনকার পর গুটি গুটি করে দিন কেটে যাচ্ছিলো, আমি তখন হোস্টেল ছেড়ে বাগুইআটি তে মাসির খালি ফ্ল্যাটে একা ই  থাকি | চাকরির সন্ধান চলছে, এর মধ্যে আর "তার" সাথে যোগাযোগ হয়নি, মানে যোগাযোগের কারণ ও থাকতে হবে তো|
শেষ দেখা করে এসেছি তো কলেজ থেকে | ভাবছি একটা চাকরি পেলেই খবর জানানোর অজুহাতে ফোন তা করেই ফেলবো , কাজের মধ্যে সারা দিন একটু পড়া শোনা করা, আর সন্ধ্যের দিকে সজার সাথে জোড়া মন্দিরের মোড়ের চায়ের দোকানে বসে আড্ডা দেওয়া | 
অবশেষে সুযোগ তা এসে গেলো, চাকরি তা জুটেই গেলো, ইন্টারভিউ সেরে বাড়ি ফিরতে রাত, পরের দিন গিয়ে অফার লেটার আনতে আনতে  দিন গড়িয়ে বিকেল | 
ফেরার পথে ভাবছি এবার ফোন টা করব, আবার একটু বাঁধো বাঁধো ঠেকছে, তাই অনেক ভেবে ই-মেইল করব ঠিক করলাম, বাড়ি ফিরে একটু মুখ হাত ধুয়েই সিফি সাইবার কাফে তে ছুট |

ওমা!!! গিয়ে দেখি আরো বড় চমক, অরে না না , ওই সাইবার কাফে তে "সে" আসেনি, যতই হোক করণ  জোহরের মুভি তো নয় !!! ইমেইল খুলতেই সবার উপরে "তার" মেইল |
আজ কলেজে সেমিস্টার এর রেজাল্ট , সুদীপ্তা সেখানে গিয়েছিলো, তখন "তার" সাথে দেখা, আর সেখানেই আমার চাকরির খবর |
না আমার আর দেওয়া হলো না, তার উপর বেশ অভিমান ভরা এক মেইল , অন্যের কাছ থেকে খবর টা জানতে পারাতে, আমি সোজা ছুট দিলাম ফ্ল্যাটে, ফোন করা দরকার | পৌঁছে দরজা খুলবো ফোন টা বেজে উঠলো, sms , তার |
- " একটা মেইল করেছি , চেক করো |"
সঙ্গে সঙ্গেই ফোন করলাম..
সেই স্বর ..
-"হ্যালো" 
- "আমি জাস্ট তোকে মেইল করতেই যাচ্ছিলাম , আর টা করতে গিয়েই দেখি তোর মেইল |"
-"আরো কিছু, আমাদের জানাতে ভুলেই গিয়েছো ! মেসেজ করলাম তাই ফোন করেছো "
- "অরে না না !! ফোন করতেই যাচ্ছিলাম , তখন ই মেসেজ টা পেলাম !"

মান ভাঙলো কিনা জানিনা , শুধু এই জানি যে তার দিকে থেকেও "কুছ কুছ হোতা হ্যায় "|
এরপর কলেজের গঙ্গা আর কেষ্টপুরের খাল দিয়ে এতটা জল বয়ে যায়নি যত গুলো sms  আমাদের মধ্যে চলেছে, যদিও সব ই খুব সাধারণ, ফরওয়ার্ড গোছের, এর মধ্যে মাঝে মাঝে ঘটকীর (ঈশিতা তখন ঘটকীর ভূমিকাতে অবতীর্ণ ) সাথে ফোন করে হাল হকিকত বোঝার চেষ্টা!! 

আরো এক মাস কেটে গেলো এভাবেই, ভাবছি বলবো কি বলবো না |
যদিও আমি মোটামুটি নিশ্চিত উত্তর টা ধনাত্মক ই হবে, তবু একটা ভয় সব সময় ই , এটা কি সঠিক সময় !!!
হঠাৎ এরকম  ই একটা sms হাতে পেয়ে গেলাম , ফ্রেন্ডশিপ গোছের, তবে একটু হিন্ট আছে, আর তার সাথে আমি আমার মনের মাধুরী মিশিয়ে আরেকটা লাইন জুড়ে দিলাম!!!! ব্যাস জয় মা বলে পাঠিয়ে দিলাম !!
এতক্ষনে আমার পালস রেট নির্ঘাত 200 পৌঁছেছে !!! তখন ফোন এর বদলে বেজে উঠলো দরজার বেল !!!! এখন আবার কে ?
দরজা খুলে দেখি.... না না এবার ও "সে" নয়, সজা দাঁড়িয়ে !

আমাকে কেমন হতভম্ব দেখে সজা বললো
-" কিরে তুই আজ চায়ের দোকানে এলিনা , কি ব্যাপার মুখ টা ওরম কেন ? "
 এমন সময় ফোন টা বেজে উঠলো , মেসেজ নোটিফিকেশন...
- আমি দ্রুত সেটা পরে সজার দিকে আবার তাকালাম..
-"জাস্ট প্রপোজ করলাম, sms  e "
-"আরিব্বাস!!! কি বলে !!"
- "বড়ই গোলমেলে "
- "অরে কি বলবি তো ?"
-" এভাবে বললে হবে না, সামনাসামনি বলতে হবে !!!!!"

#সব চরিত্র বাস্তবিক , কোনো ঘটনায় কাল্পনিক নয় #

Friday, July 1, 2016


     || পথ চলাতেই আনন্দ ||

নদীর গর্ভে বিলীন  দিন গুলো
কালের ভাঙ্গন রুখবে কোন বাঁধ !
আমাদের  ছুঁয়ে স্বপ্নেরা পাখা মেলো
পথ চলাতে মিটলো সকল সাধ |

উড়তে গেলে পাখারা ক্লান্ত হবেই
ঠোঁটে আমি তাই নিয়েছি খড়কুটো
ঘর বেঁধেছি মনের ভেতর কবেই
আজকে জিরোবো আমরা ক্ষণ দুটো |

একটা দুটো তিনটে এমনি করে
শীত পেরিয়ে বসন্ত এলো ঘিরে ,
দশটা শীতের  বিষন্ন পাতা ঝরে
নব পল্লব আলো করে এলো  নীড়ে |

চলেছি আমরা, থামবোনা কারো খোঁজে ,
আসুক তুফান, আসুক যতই বাণ,
ঘাসের সুবাস  বুকের ভেতর গুঁজে
দশক পেরোলো , পথ তবু অফুরান |

Friday, June 19, 2015

     ||  বৃষ্টিবেলা  ||

রোদের বিদায় নেবার বেলা
মেঘের আলিঙ্গনে,
টুপুর টাপুর সারা দুপুর
বৃষ্টি আগমনে ||
মেঘের চুমু নরম গালে
পাগল মনে দোলা ,
তোমার চুলের অবাধ্যতা
আমার দিনের খেলা ||